Home / নির্বাচিত কলাম / টাওয়ার হ্যামলেটস্ মেয়র নির্বাচন ২০১৫ ঃ জন বিগ্সের হাতে মেয়র পদ্ধতি নিরাপদ নয়

টাওয়ার হ্যামলেটস্ মেয়র নির্বাচন ২০১৫ ঃ জন বিগ্সের হাতে মেয়র পদ্ধতি নিরাপদ নয়

আব্দুল হাই সনজু

আব্দুল হাই সনজু

আব্দুল হাই সনজু

যে কোনো কিছু সৃষ্টি করতে হলে কিংবা ধ্বংস করতে হলে সাধারণত ক্ষমতা নিজের হাতে আনার প্রয়োজন হয়। আমার ধারণা, টাওয়ার হ্যামলেটসের মেয়র পদ্ধতির শাসনকে ধ্বংস করতেই মেয়র নির্বাচিত হতে চান জন বিগ্স। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে তিনি সাথে পেয়েছেন বাঙালি কমিউনিটির কতিপয় স্বার্থান্বেষী ব্যাক্তিকে। আমার এই দাবির পক্ষে কিছু ঐতিহাসিক দলিল উপস্থাপন করছি।

২০১৪ সালের মে মাসে অনুষ্ঠিত মেয়র নির্বাচনে লেবার পার্টির প্রার্থী ছিলেন জন বিগ্স। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জন বিগ্সকে জনগণের কাছে ‘রিব্র্যান্ডিং’ করতে টাওয়ার হ্যামলেটস লেবার পার্টির বিভিন্ন কর্মসূচিতে ঘণ ঘণ হাজির করা হচ্ছিল। গ্রেটোরেক্স স্ট্রিটের বিজনেস ডেভেলাপমেন্ট সেন্টারে গত বছরের ১১ ফেব্র“য়ারি ‘লেবার বাজেট প্রেস কনফারেন্স’ নামে এমনই একটি কর্মসূচিতে আমি যোগ দিয়েছিলাম ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিশাবে। ওই প্রেস কনফারেন্সে আমার এক প্রশ্নের জবাবে জন বিগ্স বলেছিলেন, মেয়র পদ্ধতির পক্ষে-বিপক্ষে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত গণভোটে তিনি ‘‘হ্যাঁ’’ ভোট দিয়েছিলেন। আমি তাঁর কথা বিশ্বাস করিনি। কারণ, গণভোট অনুষ্ঠানের প্রায় দুই মাস পর অর্থাৎ ২০১০ সালের ২৯ জুন গার্ডিয়ানের সাংবাদিক ডেইভ হিলকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে জন বিগ্স বলেছিলেন, ‘‘লিডারশীপ মডেল টাওয়ার হ্যামলেটসে বেশ ভালোভাবেই কাজ করছে এবং এখানে এমন কোনো কিছু মৌলিকভাবে ভেঙ্গে পড়েনি যে টাওয়ার হ্যামলেটসে একজন নির্বাচিত মেয়র প্রয়োজন’’। 

পাঠকদের সুবিধার্থে ২০১০ সালের ২ জুলাই গার্ডিয়ানের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জন বিগসের সাক্ষাতকারের লিংকটি দেওয়া হলো:

http://www.theguardian.com/uk/davehillblog/2010/jul/02/tower-hamlets-mayoral-race-labour-candidate-john-biggs


একটু ভালোভাবে খেয়াল করুন। তিনি বলছেন, তিনি গণভোটে মেয়র পদ্ধতির পক্ষে ভোট দিয়েছেন; আবার ভোটের প্রায় দুই মাসের মধ্যেই তিনি টাওয়ার হ্যামলেটসে মেয়র পদ্ধতির প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করেছেন গার্ডিয়ানে। দুই মাসের ব্যবধানে মেয়র পদ্ধতি নিয়ে এই যদি হয় তাঁর অবস্থান, তাহলে কীভাবে তাঁকে বিশ্বাস করা যায়? লুৎফুর রহমানের মামলার বিচারক রিচার্ড মওরি জন বিগ্সকে বিশ্বস্ত সাক্ষি হিশাবে গ্রহণ করলেও আমি তাঁকে সত্যবাদী হিশাবে গ্রহণ করতে পারছি না। প্রেস কনফারেন্স থেকে ফিরে এসে ওই দিনই এই বিষয়ে জন বিগ্স এবং কনজারভেটিভ দলীয় মেয়র প্রার্থী পিটার গোল্ডসের সাথে আমার একাধিক ই-মেইল বিনিময় হয়েছে। জন বিগ্স আমাকে বলতে চেয়েছেন যে তিনি মেয়র পদ্ধতি ভালোবাসেন। কিন্তু আমি তাঁকে আজও বিশ্বাস করিনা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই পদ্ধতিকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করতেই তিনি মেয়র হতে চান। আর এই প্রক্রিয়ার অংশ হিশাবেই তিনি নির্বাচিত হলে তিন জন ডেপুটি মেয়র রাখার ঘোষণা দিয়েছেন। অর্থাৎ ‘মেয়রাল’ ও ‘লীডারশিপ’ পদ্ধতির মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে একটি ককটেল রূপ দিতে চান জন বিগ্স। এর মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র সুসংহত হওয়ার চেয়ে লীডারশীপ পদ্ধতির ছদ্দাবরণে আবারও ‘সিন্ডিকেশন’ পুনরুজ্জীবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে আমি মনে করি। 

খেয়াল করে দেখুন, মেয়র পদ্ধতিকে বিলুপ্ত করার মিশনে বার বার নেতৃত্বে রাখা হচ্ছে জন বিগ্সকে। মেয়র পদ্ধতিকে ভালোবাসেন এমন অসংখ্য মেয়র প্রার্থী ছিলেন টাওয়ার হ্যামলেটসের লেবার পার্টিতে। তবে কেন আবারও জন বিগ্স? এর উত্তরে হয়তো বলা হবে: জন বিগসের মতো যোগ্য লেবার পার্টিতে অন্য কোনো প্রার্থী পাওয়া যায়নি কিংবা অন্য কেউ আগ্রহ দেখাননি; সে জন্য ‘বাই-ডিফল্ট’ তিনি প্রার্থী হয়েছেন। কিন্তু দলের স্বার্থে গণতন্ত্রকে পদদলিত করে লুৎফুর রহমানের কাছ থেকে যদি লেবার পার্টির প্রার্থীতা কেড়ে নেওয়া যায়, তবে জন বিগ্সকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো দূর্বল প্রার্থীকে কেন প্রার্থী করতে ব্যর্থ হলো লেবার পার্টি? আমি মনে করি, এই সব কিছুই একটি সুতোয় গাঁথা। 

চলুন সুতোটি আরেকটু টেনে বের করে দেখা যাক কীভাবে বাঙালি কমিউনিটির কতিপয় ব্যাক্তি জন বিগ্সের মিশনে একাত্মতা প্রকাশ করে সেই মিশনকে সফল করার চেষ্টা করছেন: 

লুৎফুর রহমানের প্রশাসন থেকে ৯ বছরের জন্য বৈশাখী মেলা আয়োজনের লাইসেন্স পাওয়ার পর এখন জন বিগ্সের পক্ষ নিয়েছেন মেলার সর্বেসর্বা সিরাজ হক। কমিউনিটিতে তথাকথিত ঐক্যের ডাক দিয়ে তিনি নাকি সমাবেশেরও আয়োজন করছেন। এই তথ্য পেয়েছি সাংবাদিক টেড জুরির ব্লগ পড়ে। গত ২ জুন প্রকাশিত ব্লগে সিরাজ হক সম্পর্কিত তথ্য পরিবেশনের ক্ষেত্রে টেড জুরি বেশ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। কেননা, অতীতে তাঁর ব্লগেই সিরাজ হকের নানা সমালোচনা উঠে এসেছিল। যাই হোক, টেড জুরি বলছেন, সিরাজ হক তাঁকে বলেছেন: ‘‘ইনাফ ইজ ইনাফ, এন্ড ভোট জন বিগ্স’’।

শুধু তাই নয়, গত বছরের মেয়র নির্বাচনের ভোট গণনা চলাকালে ট্রক্সি হলে সিরাজ হকের সাথে দেখা হয়েছিল সাংবাদিক টেড জুরির। সেখানে সিরাজ হক নাকি টেড জুরিকে বলেছিলেন, মেয়র পদ্ধতি কমিউনিটিতে বিভক্তি সৃষ্টি করেছে; তাই তিনি লীডার ও কেবিনেট পদ্ধতিকে ফিরে পেতে চান। টেড জুরির সাথে সিরাজ হকের কথোপকথনের দলিল পাওয়া যাবে নীচে উল্লেখিত লিংকে:

http://trialbyjeory.com/2015/06/02/brick-lane-curry-king-and-ex-lutfur-money-man-shiraj-haque-says-vote-biggs/


ঠিক এই জায়গায়ই জন বিগ্স ও সিরাজ হকের পথ একসাথে এসে মিলেছে। অর্থাৎ দুই জনই মেয়র পদ্ধতির সমালোচক এবং তাঁরা এই পদ্ধতি পছন্দ করেন না। তাই আমি আশঙ্কা করছি মেয়র নির্বাচিত হলে এই পদ্ধতিকে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করার কর্মসূচি হাতে নিতে পারেন জন বিগস। আর জন বিগ্সের মাঠকে সমতল করে দেওয়ার কাজে নেমেছেন সিরাজ হকের মতো কতিপয় বাঙালি ব্যাক্তি।

কিন্তু সিরাজ হকের উদ্যোগে কমিউনিটিতে ঐক্য সৃষ্টির ডাক কতোটা সুফল বয়ে আনবে জন বিগসের জন্য? উত্তরে সহজেই বলা যায় যে, কোনো সুফলই তিনি আনতে পারবেন না। কারণ মেয়র পদ্ধতি পছন্দ না করলেও মেয়র প্রার্থী হয়েছেন জন বিগ্স; কিন্তু কৌশলগত কারণে এই কথা তিনি সজোরে উচ্চারণ করতে পারছেন না। অন্যদিকে, লীডারশীপ ও কেবিনিট পদ্ধতিতে ফিরে যেতে ইচ্ছুক সিরাজ হক জন বিগ্সকে নির্বাচিত করার মাধ্যমেই সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে চান। এইখানেই মূল ‘দ্বন্দ্ব’। ফলে এই দুই জন লোক তথাকথিত যে ঐক্যের কথা গলা ফাটিয়ে বলছেন, সেটি আসলে ‘কাঁঠালের আমসত্ব’।

আগামী ১১ জুন অনুষ্ঠিতব্য মেয়র নির্বাচনে এই এলাকার জনগণের কাছে দুটি পথ খোলা রয়েছে। প্রথমত: জন বিগ্সকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে মেয়র পদ্ধতির অবসান ঘটিয়ে আবারও লেবার পার্টির শাসনের গোলক ধাঁধায় পড়ার আশঙ্কা। দ্বিতীয়ত: জাতীয় রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি পরিহার করে ‘লোকাল নলেজ’ কে প্রাধান্য দিয়ে টাওয়ার হ্যামলেটসের জনগণের কল্যাণে স্বাধীনভাবে কাজ করার জন্য স্বতন্ত্র একজন প্রার্থীকে মেয়র নির্বাচনের সুযোগ।   

Muhammad Abdul Hye Ibne Safi